দুম্বা পালনে সফল রবিউল, বছরে আয় ৪০ লাখ টাকা

prothomalo bangla 2026 08 16 efb9enml dumba 1
খামারের সামনের খোলা জায়গায় কয়েকটি দুম্বা খাবার খাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামে

কয়েকটি দুম্বা দিয়ে শুরু। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগই এখন বড় খামারে রূপ নিয়েছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫৪) ‘নিয়তি দুম্বা ফার্ম’ গড়ে এখন স্বাবলম্বী।

রবিউলের খামারে বর্তমানে ৬০টি দুম্বা রয়েছে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদসহ বিভিন্ন সময়ে বিক্রি হয় ৩০টির মতো দুম্বা। তাঁর হিসাবে, বছরে তাঁর আয় প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

যেভাবে শুরু

পৈতৃক কিছু জমি ছিল রবিউল ও তাঁর বড় ভাই রেজাউল ইসলামের (৫৬)। চাষাবাদ করতেন দুই ভাই। কৃষিকাজে সফলতা না পেয়ে রেজাউল সৌদি আরবে চলে যান। রবিউলকে দুম্বা পালনের ধারণা দেন তিনি। সেখান থেকেই রবিউলের স্বপ্নের শুরু। ২০২২ সালে ছুটিতে দেশে এসে রেজাউল দুটি দুম্বা সংগ্রহ করেন। পরে আরও ছয়টি দুম্বা এনে দেন ছোট ভাইকে। ‘টার্কি’ ও ‘আওয়াসি’ জাতের এসব দুম্বা দিয়েই শুরু হয় রবিউলের খামার।

রবিউল বলেন, এসব জাতের দুম্বার প্রজননক্ষমতা ভালো। বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই খামারে দুম্বার সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুই বছরের মধ্যে সংখ্যা ৬৫টিতে পৌঁছায়। এরপর দুম্বা বিক্রি শুরু করেন তিনি।

আবহাওয়াও দুম্বা পালনে সহায়ক

খামারের দুম্বাগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছে বলে জানান রবিউল। তিনি বলেন, শুরুর দিকে দুম্বাগুলো দিনভর চিৎকার-চেঁচামেচি করত। এক-দুই মাসের মধ্যেই এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কাঁঠারিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশে দুই কক্ষের একটি বড় খামার। খামারের মেঝে তৈরি করা হয়েছে কাঠের পাটাতন দিয়ে। পাটাতনে প্রায় এক ইঞ্চি পরপর ফাঁক রাখা হয়েছে। এতে দুম্বার মলমূত্র নিচে পড়ে যায়।

খামারের সামনের খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছোট-বড় ৬০টি দুম্বা। কোনোটি ঘাস খাচ্ছে, কোনোটি ছায়ায় বসে আছে। দুম্বাগুলোর দেখভালের জন্য রয়েছেন দুজন রাখাল। তাঁরা দিনমজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। একজন রাখাল প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং অন্যজন ৪০০ টাকা মজুরি পান।

prothomalo bangla 2026 08 16 jkamnrs6 dumba 2
দুম্বার খামারি রবিউল ইসলাম। বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামে

খাবারে বাড়তি ঝামেলা নেই

গরু-ছাগলের মতোই দুম্বার প্রধান খাবার কচি ঘাস। এর পাশাপাশি খইল, ভুসি, খড় ও চিটাগুড়ে ভেজানো সাইলেজও (গাঁজন বা ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ার সংরক্ষিত পশুখাদ্য) দেওয়া হয়। এসব খাবারেই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে দুম্বাগুলো।

খামারের মালিক বলেন, দুম্বা পালনে খাবার ও পরিচর্যার খরচ তুলনামূলক কম। তাই সঠিকভাবে পালন করতে পারলে এতে ভালো লাভ করা সম্ভব।

কোরবানির ঈদে চাহিদা বেশি

সারা বছরই কমবেশি দুম্বা বিক্রি হয় রবিউলের খামার থেকে। অনলাইন ও সরাসরি—দুইভাবেই ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।

২০২৫ সালের কোরবানি ঈদে খামার থেকে ২৭টি ও ২০২৬ সালের ঈদে ৩০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি দুম্বা ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। একেকটির ওজন ৫০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত।

আশপাশের মানুষের চাহিদার কারণে দুম্বা জবাই করে মাংসও বিক্রি করেন রবিউল। তিনি জানান, প্রতি কেজি মাংস ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন। ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকে পাইকারেরা এসে দুম্বা কিনে নিয়ে যান। কেউ আবার খামারে পালনের উদ্দেশ্যে দুম্বা সংগ্রহও করেন।

prothomalo bangla 2026 08 16 r87z5rkt dumba 3
খামারের ভেতরে বসে আছে কয়েকটি দুম্বা। বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈয়দপুরের বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামে

নতুন সম্ভাবনার পথ সুগম হচ্ছে

ইসলামী ঐতিহ্যে দুম্বার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দপুরের মাওলানা সাইদুল ইসলাম বলেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কোরবানির বাজারে দুম্বার চাহিদা বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এ ধরনের খামারের সম্ভাবনাও রয়েছে।

রবিউলের খামারটি দেখে গ্রামের অনেকেই দুম্বা পালনে আগ্রহী হয়েছেন বলে জানান প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম।

দুম্বার খামার দেখার জন্য সেখানে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দিতা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জায়গাটি আমার ভালো লেগেছে। গ্রামের একজন মানুষের নিরন্তর চেষ্টার ফল এই খামার।’

প্রাণিসম্পদ বিভাগ যা বলছে

মরুর প্রাণী দুম্বার খামারটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবু কায়েস বিন আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারটির ওপর নজর রাখছে। খামারে রোগবালাইয়ের সমস্যাও তেমন দেখা যায় না। ভবিষ্যতে এ ধরনের খামার আরও ছড়িয়ে পড়লে দেশে মাংসের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।

কয়েকটি দুম্বা দিয়ে শুরু করা রবিউলের উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে লাভজনক একটি খামারে। তাঁর খামার দেখে আশপাশের অনেকেই দুম্বা পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

Scroll to Top