বক্স অফিসে ঝড় তোলা ‘দ্য অডিসি’ দেখার আগে যে তিন কারণে ‘ট্রয়’ দেখবেন

prothomalo bangla 2026 07 25 lwreuxbx c2ee716d c686 4e2b 83a1 323fc4a6b771

‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় ম্যাট ডেমন ও ‘ট্রয়’ সিনেমায় ব্র্যাড পিট

গত সপ্তাহেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে বহুল আলোচিত সিনেমা ‘দ্য অডিসি’। হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমাটি বড় পর্দায় আসার পর থেকেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে চলছে তুমুল আলোচনা। বক্স অফিসে এ পর্যন্ত ৩৬৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে ম্যাট ডেমন অভিনীত সিনেমাটি। নোলানের ‘দ্য অডিসি’ মুক্তির ঘোষণার পর থেকেই নতুন করে আলোচনা হচ্ছে গ্রিক পুরাণ নিয়ে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, সিনেমাটি দেখার আগে কি কোনো প্রস্তুতি দরকার?
উত্তর হলো, সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ ‘দ্য অডিসি’ নিজেই একটি স্বতন্ত্র গল্প। তবে যদি ‘দ্য অডিসি’ শুধু একটি ফ্যান্টাসি অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা হিসেবে নয়, বরং হাজার বছরের পুরোনো এক মহাকাব্যের পরের অধ্যায় হিসেবে উপভোগ করতে চান, তাহলে ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া উলফগ্যাং পিটারসেনের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘ট্রয়’ হতে পারে সবচেয়ে সেরা প্রস্তুতি। কারণ, ‘দ্য অডিসি’র গল্প ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়, যেখানে ‘ট্রয়’-এর ট্র্যাজেডি শেষ হয়েছিল।

প্রেম থেকে শুরু হয় যে মহাযুদ্ধ
সবকিছুর শুরু একটি কূটনৈতিক সফর থেকে। ট্রয়ের দুই রাজপুত্র—হেক্টর ও প্যারিস শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে স্পার্টায় যান। সেখানেই স্পার্টার রানি হেলেনের সঙ্গে পরিচয় হয় প্যারিসের। এরপর হেলেনকে নিয়ে তিনি ট্রয়ে ফিরে আসেন। তবে তা প্রেম ছিল, নাকি অপহরণ—এ নিয়ে গ্রিক পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, দুজন প্রেমে পড়ে স্বেচ্ছায় ট্রয়ে চলে যান। আবার কেউ বলেন, প্যারিস হেলেনকে অপহরণ করেছিলেন। তবে সত্য যা–ই হোক, এ ঘটনার ফলাফল হয়েছিল ভয়ংকর। তবে ‘দ্য অডিসি’তে ট্রয় যুদ্ধের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন নির্মাতা। কী? সেটা নাহয় সিনেমাটি দেখেই জানুন।

prothomalo bangla 2026 07 25 vuywp8l0 mv5bmtmwndm0ndi5ov5bml5banbnxkftztcwotc5mtqymw v1

‘ট্রয়’–এর দৃশ্য।

নিজের স্ত্রী ট্রয়ের রাজপুত্রের সঙ্গে চলে যাওয়ায় স্পার্টার রাজা মেনেলাউস অপমানিত হন। কারণ, এতে তাঁর রাজকীয় সম্মান ও মর্যাদাহানি হয়। মেনেলাউসের বড় ভাই, মাইসিনির রাজা আগামেমনন, এটিকে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। তিনি গ্রিসের বিভিন্ন রাজ্য ও বীর যোদ্ধাদের এক পতাকার নিচে একত্রিত করেন।

অ্যাকিলিস, ওডিসিয়ুস, অ্যায়াক্স, নেস্টরের মতো কিংবদন্তি যোদ্ধারা সেই অভিযানে যোগ দেন। শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত যুদ্ধগুলোর একটি—ট্রয় যুদ্ধ। শুরু হয় ইতিহাস–বিখ্যাত সেই ট্রয় যুদ্ধ! টানা ১০ বছর ধরে চলা সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে গ্রিক কবি হোমার রচনা করেন দুটি অমর মহাকাব্য—‘দ্য ইলিয়াড’ ও ‘দ্য অডিসি’, যা আজও বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু ‘ট্রয়’ কেবল যুদ্ধের গল্প নয়। এটি মানুষের অহংকার, ভালোবাসা, প্রতিশোধ, সম্মান আর মৃত্যুকে ঘিরে নির্মিত এক বিশাল ক্যানভাসের চলচ্চিত্র।

অ্যাকিলিস ও হেক্টর: দুই অমর চরিত্র
‘ট্রয়’–এর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু যুদ্ধ নয়, অ্যাকিলিস আর হেক্টরের মতো দুই অসাধারণ চরিত্র। অ্যাকিলিস চরিত্রে ব্র্যাড পিটকে প্রথম দেখার পরই বোঝা যায়, কেন এই চরিত্রের জন্য তাকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। অ্যাকিলিস শুধু দুর্ধর্ষ এক যোদ্ধা নন, তিনি জানেন, মৃত্যু একদিন আসবেই। তাই দীর্ঘ জীবন তিনি চান না। তিনি চান এমন এক জীবন, যার গল্প হাজার বছর পরও মানুষ মনে রাখবে। সে কারণেই যুদ্ধক্ষেত্রে তার আত্মবিশ্বাস, অহংকার আর মানসিকতা অন্য সবার চেয়ে তাকে আলাদা করে তোলে।
ব্র্যাড পিট অ্যাকিলিসের শক্তির পাশাপাশি তাঁর ভেতরের দ্বন্দ্ব, একাকিত্ব আর মানবিক দিকটিও দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই অনেকের কাছেই এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়।

prothomalo bangla 2026 07 25 ohogllmp mv5bmjixmdexnzc4nf5bml5banbnxkftztcwmzu5mtqymw v1

‘ট্রয়’–এর দৃশ্য।

অন্যদিকে ট্রয়ের যুবরাজ হেক্টর ঠিক অ্যাকিলিসের বিপরীত। তিনি যুদ্ধ জিতে অমর হতে চান না। তিনি চান নিজের পরিবার, নিজের মানুষ আর নিজের শহরকে রক্ষা করতে। যুদ্ধ তার কাছে গৌরবের নয়, দায়িত্বের। এরিক বানা হেক্টর চরিত্রে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে সিনেমা যত এগোয়, দর্শক ততই তার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অ্যাকিলিস ও হেক্টরের দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুধু দুই যোদ্ধার লড়াই নয়; এটি হয়ে ওঠে দুই ভিন্ন আদর্শ, দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই। আর সে কারণেই এই দৃশ্য হলিউডের অন্যতম স্মরণীয় হৃদয়স্পর্শী যুদ্ধদৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

prothomalo bangla 2026 07 25 1o2j9021 mv5bmtqznzy2mdu3m15bml5banbnxkftztcwnjc5mtqymw v1

‘ট্রয়’–এর দৃশ্য।

যুদ্ধের চেয়েও বড় এর নির্মাণ
দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ‘ট্রয়’ সিনেমা দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে এর বিশাল আয়োজন। হাজারো সৈন্যের যুদ্ধ, ট্রয়ের বিশাল দুর্গ, সমুদ্রজুড়ে যুদ্ধজাহাজ আর যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যগুলো সত্যিকারের যুদ্ধক্ষেত্রের অনুভূতি এনে দেয়। তলোয়ারের ঝনঝনানি, ঢালের সংঘর্ষ আর যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলা—সবকিছুই এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যেন দর্শককে সেই সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী করে তোলে।
এই নির্মাণকে আরও শক্তিশালী করেছে জেমস হর্নারের আবহসংগীত। যুদ্ধের দৃশ্যে এটি উত্তেজনা বাড়ায়, আবার শান্ত ও আবেগঘন মুহূর্তগুলোতেও গল্পের অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই দুই দশক পরও ‘ট্রয়’ শুধু গল্প বা অভিনয়ের জন্য নয়, এর নির্মাণশৈলীর জন্যও দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।

তবে ‘ট্রয়’ দেখার সবচেয়ে বড় কারণ শুধু এর নির্মাণ, অভিনয় বা যুদ্ধের দৃশ্য নয়। আসল কারণ, এই সিনেমাই ‘দ্য অডিসি’র গল্পের ভিত্তি তৈরি করে। ও, আরেকটা কথা তো বলাই হয়নি, ‘ট্রয়’ আর ‘দ্য অডিসি’র কিন্তু আরেকটি যোগ আছে। ‘ট্রয়’ সিনেমাটি কিন্তু নির্মাণের প্রস্তাব পেয়েছিলেন ক্রিস্টোফার নোলানও! কোন কারণে হয়নি, সেই ঘটনার দুই দশকের বেশি সময় পরে তিনি ফিরলেন ‘দ্য অডিসি’ নিয়ে।

‘দ্য অডিসি’র আগে ‘ট্রয়’ কেন দেখবেন?
প্রথমত, ‘ট্রয়’ যুদ্ধের পুরো প্রেক্ষাপট বুঝতে। ‘দ্য অডিসি’ শুরু হয় ট্রয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। কিন্তু সেই যুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল, কীভাবে টানা ১০ বছর চলেছিল, অ্যাকিলিস, হেক্টর, আগামেমনন, মেনেলাউস বা ওডিসিয়ুসের মতো চরিত্ররা কে ছিলেন—এসব জানলে গল্পের অনেক তথ্য বুঝতে সুবিধা হয়।

দ্বিতীয়ত, অডিসিয়ুস চরিত্রটিকে আগে থেকেই চিনতে পারবেন। ‘ট্রয়’-এর মূল আকর্ষণ অ্যাকিলিস ও হেক্টর হলেও, গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অডিসিয়ুস। তিনি শক্তির চেয়ে বুদ্ধির ওপর বেশি ভরসা করেন। দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধের শেষ দিকে তাঁর একটি পরিকল্পনাই পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইতিহাস ও গ্রিক পুরাণে সেই পরিকল্পনাই ‘ট্রোজান হর্স’ নামে পরিচিত। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’ সিনেমারও মূল চরিত্র অডিসিয়ুস।

তৃতীয়ত, অডিসিয়ুসের বাড়ি ফেরার দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। ‘দ্য অডিসি’ যুদ্ধের গল্প নয়; এটি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরতে চাওয়া এক মানুষের গল্প। ট্রয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও অডিসিয়ুসকে আরও দশ বছর সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে হয়। পথে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় একের পর এক বাধা। ‘ট্রয়’ আগে দেখে গেলে বুঝতে পারবেন, তিনি শুধু বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন না; দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি, হারানো সঙ্গী আর অতীতের কৃতকর্মের ভারও বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই ‘দ্য অডিসি’ তখন শুধু একটি রোমাঞ্চকর অভিযান নয়, একজন মানুষের দীর্ঘ ও বেদনাভরা ঘরে ফেরার গল্প হয়ে ওঠে।

prothomalo bangla 2026 07 25 x27xsnvu mv5bmtuymtu1ndgzml5bml5banbnxkftztcwndu5mtqymw v1

‘ট্রয়’–এর দৃশ্য

জেনে রাখা ভালো
‘ট্রয়’ হোমারের ‘দ্য ইলিয়াড’-এর হুবহু চলচ্চিত্ররূপ নয়। পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন গল্পটিকে আরও বাস্তবধর্মীভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন। তাই গ্রিক পুরাণে যেভাবে জিউস, পসেইডন, অ্যাথেনা, অ্যাপোলো কিংবা অ্যাফ্রোদিতি মানুষের জীবনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন, সিনেমায় সেই অতিপ্রাকৃত দিকটি প্রায় পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেনেলাউস, হেলেনসহ কয়েকটি চরিত্রের উপস্থাপনায় এবং কিছু ঘটনার পরিণতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তবে এসব পরিবর্তনের কারণে ‘ট্রয়’–এর গুরুত্ব একটুও কমে না। বরং গ্রিক পুরাণের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হিসেবে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে আরও সহজ হয়ে উঠেছে। আর সেখানেই ‘ট্রয়’–এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। ‘দ্য অডিসি’র গল্পটি বুঝতে এই সিনেমাটি হয়ে উঠতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তাই নোলানের ‘দ্য অডিসি’ দেখার আগে ‘ট্রয়’ দেখলে আপনার ‘দ্য অডিসি’ দেখার অভিজ্ঞতা আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

Scroll to Top