বড়শিতে উঠল ৭৬ কেজি ওজনের মাছ

prothomalo bangla 2026 08 20 gj5lpmfb fishingsuprio roy 8
মাছটি এত বড় ছিল যে ঠিকমতো সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে

ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় মাছ ধরায় লম্বা বিরতি পড়ে গিয়েছিল। বন্ধু ওমর হায়দার অনেক দিন ধরেই বলছিল, ‘চল, কোথাও মাছ ধরতে যাই।’ দেশে আমরা নানা জায়গায় মাছ শিকার করেছি। তবে এখন শখের মাছ শিকারও অনেকটা বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। ভাবলাম, দেশে যে খরচ করে মাছ ধরব, তার চেয়ে বরং বিদেশে গিয়ে নতুন একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে আসি।

যা ভাবা তা-ই কাজ। থাইল্যান্ডে মাছ ধরার এমন অনেক জায়গা আছে, জানতাম। খোঁজ নিয়ে ৪২ বছরের পুরোনো বুং সামরান ফিশিং পার্কের প্যাকেজ সম্পর্কে জানলাম। সবকিছু মিলে যাওয়ায় বুকিংও করলাম। বুং সামরান নানা সময়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করে। তবে আমরা যাচ্ছি ব্যক্তিগত ফিশিংয়ে।

৫ আগস্ট দুজনে ব্যাংককে পৌঁছাই। রাতটা কাটিয়ে পরদিন গাড়িতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ফিশিং পার্কে পৌঁছাই। নিবন্ধন শেষে আমাদের একটি বাংলোয় নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় একজন গাইড। এখানকার প্যাকেজে ফিশিং রড, হুইল ও মাছ ধরার অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, গাইড, বাংলোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকে। প্রতিদিন খরচ হয় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার বাথ। আমরা দুজনে মিলে একটি ফিশিং রড নিয়েছিলাম। লেগেছে ৬ হাজার বাথ, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২২ হাজার টাকা। সঙ্গে মাছ ধরার লাইসেন্স নিতে হয়েছে। এক দিনের এই লাইসেন্সের জন্য জনপ্রতি খরচ হয়েছে ২ হাজার বাথ, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টাকা।

prothomalo bangla 2026 08 20 q4e30sdw 104971025 269519064144845 8138423340969279743 n
বুং সামরান ফিশিং পার্কের বাংলো

বুং সামরান প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি হ্রদ। এখানে ৪০টির বেশি প্রজাতির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশের ওজন ২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে জায়ান্ট সিয়ামিজ কার্প, যেগুলোর ওজন ১০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আমরা বাংলোয় ওঠার পর সহকারী ছেলেটি টোপ তৈরির কাজ শুরু করল। প্রায় ৩০ কেজি খাবার দিয়ে টোপ তৈরি করল। কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করে শুধু চালের গুঁড়া, ছাতুসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় সেই টোপ।

prothomalo bangla 2026 08 20 tfib7l4i fishing suprio roy 9
স্থানীয় গাইড (বাঁয়ে) ও বন্ধু ওমর হায়দারের (ডানে) সঙ্গে সুপ্রিয় রায়

প্রথম টানেই ৩৬ কেজি

ছিপ ফেলার মিনিট পনেরোর মধ্যেই টান পড়ল। ওমর হায়দার উচ্ছ্বসিত। মাছটি তখন তাঁর নিয়ন্ত্রণে। বোঝা যাচ্ছিল, বেশ বড় মাছ। মাছ টোপ খাওয়ার পর ছিপের সুতা কিছুটা ছেড়ে দিতে হয়। মাছের টান বুঝে আবার সুতা গুটিয়ে আনতে হয়। পুরো বিষয়টি অনেকটা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো—কখনো সুতা ছেড়ে দিতে হচ্ছে, আবার কখনো টেনে কাছে আনতে হচ্ছে। বড় মাছ জোরে টান দিলে সুতা ছেড়ে দিতে হয়। আবার সুযোগ বুঝে ধীরে ধীরে টেনে মাছকে কাছে আনতে হয়। এভাবে ২০ মিনিটের বেশি সময় পর মাছটি একসময় ক্লান্ত হয়ে কাছে এল।

মাছটি যখন কাছে এল, দেখি জায়ান্ট মেকং ক্যাটফিশ। এত দিন পাঁচ কেজি ওজনের মাছ তুললেই নিজেদের মধ্যে হই হই রইরই পড়ে যেত। এত বড় মাছ আমাদের মতো শখের শিকারির পক্ষে তোলা সহজ না। গাইড ছেলেটি এগিয়ে এলেন। নেট দিয়ে তিনজনে মিলে আলতো করে মাছটাকে বাংলোর পাটাতনে তুলে ফেললাম। মুখ থেকে বড়শি খুলে ফেলা হলো।

আমরা যে বড়শি ব্যবহার করি, এর সঙ্গে এটির পার্থক্য হলো, অগ্রভাগে বার্ব বা উল্টোমুখী ফলা নেই। ফলে মাছ বড়শি গিলে ফেললেও সহজে খুলে ফেলা যায় এবং মাছের ক্ষতি কম হয়।

মাছ তুলে ওজন দেওয়া হলো। প্রথমবারই আমরা ৩৬ কেজি ওজনের একটি মাছ তুলেছি! মাছটির সঙ্গে দুজনে আলাদা আলাদাভাবে ছবি তুললাম। এরপর দ্রুত পানিতে ছেড়ে দিলাম!

কী, অবাক হচ্ছেন? এখানে নিয়মই হলো ‘ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ’—ধরবেন, ছবি তুলবেন, তারপর ছেড়ে দেবেন। মাছের প্রতি তারা খুব যত্নশীল। মাছ যাতে আহত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা হয়। মাছের শরীরে কোনো ধরনের ক্ষতি হলে বা মাছ মারা গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়।

prothomalo bangla 2026 08 20 dyxikm02 fishing suprio roy 2
ছিপ ফেলার মিনিট পনেরোর মধ্যেই টান পড়ল

৭৬ কেজির হাসি

প্রথম মাছ ধরার পর পরের ধাপের প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সময় গেল। ১২ মিনিট পরই আবার হিট। এবার আমি ধরলাম। ওজন প্রায় ৫০ কেজি। দুজনে মিলে ছবি তুললাম। তারপর সেটিকেও ছেড়ে দেওয়া হলো।

ভরদুপুরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করল। ততক্ষণে আমরা প্রায় ২২ থেকে ২৩টি বড় মাছ ধরে ফেলেছি। ছোট মাছও পেয়েছি অনেক। ফিশিংয়ের সময় ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু বেলা একটা বাজতেই আর কুলাতে পারছিলাম না। মাছ ধরতে ধরতে দুই হাতসহ পুরো শরীর ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। বড় মাছের সঙ্গে দীর্ঘ সময় লড়াই করলে শরীরের ওপর যে কতটা চাপ পড়ে, সেদিন বুঝেছি।

তবে দিনের সবচেয়ে বড় চমক তখনো বাকি। শেষ দিকে আমি ৭৬ কেজি ওজনের একটি মাছ পাই। এটিও ছিল মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ। মাছটি এত বড় ছিল যে ঠিকমতো সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে। এত বড় মাছ কাছ থেকে দেখা এবং সেটির সঙ্গে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।

prothomalo bangla 2026 08 20 qaf94imq fishing suprio roy 7
জায়ান্ট মেকং ক্যাটফিশ ধরার পর

আবার যাব

এই ফিশিং পার্কে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ কেজি ওজনের মাছ ধরার রেকর্ড আছে। সেখানে হল অব ফেমের মতো একটি জায়গায় বিশ্বের নামজাদা মাছশিকারিদের সঙ্গে ১০০ কেজির বেশি ওজনের মাছ ধরা শিকারিদেরও জায়গা দেওয়া হয়। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল অন্তত ১০০ কেজি ওজনের একটি মাছ ধরব। এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

থাইল্যান্ডের এই সফরের কথা আমাদের শখের মাছশিকারিদের একটি গ্রুপে শেয়ার করেছি। অনেকেই আগ্রহ দেখিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো আমাদের দেখাদেখি শিগগিরই সেখানে মাছ ধরতে যাবেন। আমার নিজেরও আবার যাওয়ার ইচ্ছা আছে। আমরা আবার যাব—হল অব ফেমে নিজেদের ছবি তুলতেই হবে!

Scroll to Top