বর্ষায় খইয়াছড়ার বন্য সৌন্দর্য, যাওয়ার আগে মাথায় রাখতে হবে যে ঝুঁকির কথা

বর্ষায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরনা অপরূপ সৌন্দর্যে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। গভীর বন, পাহাড়ি ছড়া ও ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঝরনা। তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকিও। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোয় ৩৭টি দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু ও ৫১ জন আহত হয়েছেন, যার বেশির ভাগই খইয়াছড়া ঝরনায়। তাই খইয়াছড়া ঝরনায় যেতে হলে মানতে হবে কিছু বিধিনিষেধ ও সতর্কতা।

prothomalo bangla 2026 07 21 onwuhpqv whatsapp image 2026 07 21 at 9.06.51 pm

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরনা। গত সোমবার দুপুরে তোলা

বহুদূর থেকে শোনা যায় ঝরনার পানি পড়ার ঝমঝম শব্দ। গভীর বন পেরিয়ে শব্দের উৎসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে বিস্ময়ের একটা ধাক্কা লাগে। বর্ষায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরনা তার সৌন্দর্যের সবটুকু যেনে মেলে ধরে। তবে এ সৌন্দর্যের আড়ালে পদে পদে ওত পেতে থাকে বিপদও। একটু অসতর্ক হলেই ঝুঁকি রয়েছে দুর্ঘটনার।

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোয় ছোট–বড় ৩৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৭ জন পর্যটক। আহত হয়েছেন ৫১ জন। মিরসরাইয়ে ঝরনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে খইয়াছড়া ঝরনায়। তবু প্রতিবছর, বিশেষ করে বর্ষায় খইয়াছড়া দেখতে দলে দলে পর্যটকেরা ছুটে আসেন। বুনো ট্রেইল ধরে, পাহাড় ডিঙিয়ে চলে যান প্রকৃতির বিস্ময়ের কাছে। ঝরনায় আসা পর্যটকদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। এ কারণে ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেন না তাঁরা।

prothomalo bangla 2026 07 21 gnk29rz8 whatsapp image 2026 07 21 at 9.08.29 pm

ঝরনার পথে পথে পড়বে পাথুরে ঝিরি পথ। চলতে হবে দেখে শুনে। গত সোমবার দুপুরে তোলা

খইয়াছড়া ঝরনার অবস্থান, যাওয়ার পথে নিবিড় বন আর পাহাড় পর্যটকদের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মিরসরাই উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খইয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত এ ঝরনা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ি বন পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে। মহাসড়ক ফেলে এক কিলোমিটার পাকা সড়ক পার হলেই শুরু গ্রামীণ মেঠো পথ। এর পর থেকেই শুরু ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া। স্বচ্ছ জলের পাথুরে সেসব ছড়ায় পা ছোঁয়ালেই শীতল হয় শরীর। সে পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছড়ার দুই পাশের পাহাড়ি বন থেকে ভেসে আসা পাখিদের ডাকাডাকির শব্দ যেন মনে হয় প্রকৃতির গান। ছড়ার দিকে হেলে পড়া গাছে পাকা জংলি ডুমুরের থোকা বুনো পথে স্বাগত জানায় পর্যটকদের। ছড়া পার হলে পাহাড় ডিঙানোর পালা। কয়েক ধাপে ছোট–বড় কয়েকটি পাহাড় পেরোলেই চোখে পড়বে খইয়াছড়া ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য।

প্রথম দেখায় পাহাড়ঘেরা এ ঝরনার সৌন্দর্য নির্বাক করে দেবে যে কাউকে। সুউচ্চ পাহাড়চূড়া থেকে সশব্দে নেমে আসা পানি যেন এক মোহনীয় সুর ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। খইয়াছড়া ঝরনা বাংলাদেশের বড় পাহাড়ি ঝরনাগুলোর মধ্যে একটি। এটি ছাড়াও মিরসরাইয়ে নাপিত্তাছড়া, সোনাইছড়ি, বাওয়াছড়া, রূপসী নামের বেশ কয়েকটি পরিচিত ঝরনা রয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের ভেতরে পড়েছে ঝরনাগুলো। এসব ঝরনা বন বিভাগ ইজারাদারের মাধ্যমে পরিচালনা করে।

সোমবার দুপুরে খইয়াছড়া ঝরনায় গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির মধ্যেও পর্যটকের সংখ্যা কম নয়। অনেকে দল বেঁধে হইহল্লা করছিলেন ঝরনার নিচের কূপের পানিতে। ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছিলেন কেউ কেউ। সেখানে কথা হয় ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজমল হাকিমের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তিন বন্ধু মিলে এবারই প্রথম খইয়াছড়া ঝরনায় ঘুরতে এলাম। এ ঝরনা অপরূপ। এখানে এসে শুধু ঝরনা নয়, বন-পাহাড়ের মিতালি, ঝিরি আর পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করার আনন্দও পেয়েছি।’

prothomalo bangla 2026 07 21 sxz8kcjr whatsapp image 2026 07 21 at 9.10.03 pm

গভীর বনের ভেতর দিয়ে ঝরনার ট্রেইল ধরে যাচ্ছেন পর্যটকেরা। গত সোমবার দুপুরে তোলা

ভ্রমণে সতর্কতা

খইয়াছড়া ঝরনা ভ্রমণে পর্যটকদের মেনে চলতে হবে কিছু সতর্কতা, বিশেষ করে ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ছড়ায় ঢল তৈরি হয় বলে ওই সময় ঝরনাভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। বন বিভাগ ও ইজারাদার নির্দেশিত রুট ব্যতীত অন্য পথে ভ্রমণ করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে ঝরনাচূড়ায় ওঠা একেবারেই নিষেধ। ঝরনার বিপজ্জনক স্থানে দাঁড়িয়ে সেলফিও তোলা যাবে না, বিশেষ করে গাইড সঙ্গে নিয়ে ঝরনাভ্রমণ হবে সবচেয়ে নিরাপদ।

খইয়াছড়া ঝরনাসহ বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যান এলাকার ঝরনাগুলো ইজার নিয়েছে থ্রি-বি নামের একটি পর্যটন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আকার–আয়তনে খইয়াছড়া বাংলাদেশের বড় ঝরনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রতিবছরই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। তবে কিছু পর্যটকের অসতর্কতা আর অতি কৌতূহলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে নিরাপদে ঝরনাভ্রমণ করতে আমরা পর্যটকদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকি। এ ছাড়া বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীও।’

prothomalo bangla 2026 07 21 eavo0ej9 whatsapp image 2026 07 21 at 9.11.04 pm

গভীর বন পেরিয়ে যেতে হবে খইয়াছড়া ঝরনায়। গত সোমবার দুপুরে তোলা

জানতে চাইলে বারইয়াঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপজেলাজুড়ে যত পাহাড়ি ঝরনা আছে, সেগুলোর মধ্যে খইয়াছড়া ঝরনা সবচেয়ে বড়। বর্ষার এ সময়ে এই ঝরনার সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সেই সৌন্দর্য দেখতে দেশের সব প্রান্তের মানুষ ছুটে আসেন। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অতি উৎসাহী কিছু পর্যটক ঝরনাভ্রমণে এসে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন, বিশেষ করে ছড়া এলাকায় কূপগুলো সতর্কতার সঙ্গে পার হওয়া, ভারী বৃষ্টির সময় ঝরনা এলাকায় ভ্রমণ না করা, ঝরনার চূড়ায় উঠে সেলফি না তোলাসহ বেশ কিছু বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে।

prothomalo bangla 2026 07 21 k9eavi4n whatsapp image 2026 07 21 at 9.12.04 pm (1)

কুল কুল করে বয়ে যাচ্ছে খইয়াছড়া ঝরনার জল। গত সোমবার দুপুরে তোলা

যেভাবে যাবেন

খইয়াছড়া ঝরনা দেখতে এলে ঢাকা-চট্টগ্রাম বা দেশের যেকোনো শহর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ঝরনার রাস্তায় যাওয়া যাবে। পথে খাওয়াদাওয়া করা যাবে ঝরনা এলাকায়। এ ছাড়া বড়তাকিয়া বাজারের রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। রাত্রি যাপন করতে চাইলে থাকা যাবে বড়তাকিয়া বাজার, মহামায়া হ্রদ ও বারইয়ারহাট পৌর বাজারের কয়েকটি হোটেলে। এ ছাড়া সোনা পাহাড়েও আছে একটি ফার্ম হাউস রিসোর্ট। সেখানে থাকতে হলে আগে থেকে বুকিং দিতে হবে।

Scroll to Top