মেলবোর্ন, সিডনি বাদ দিয়ে কেন ডারউইনে হচ্ছে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট?

darwin test msr9k0wrbopi2ek 20260813143605

বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার চলমান টেস্ট সিরিজের ভেন্যু নিয়ে শুরু থেকেই ছিল কৌতূহল। সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন কিংবা পার্থের মতো অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট ভেন্যুর বদলে ডারউইনের মারারা ওভালে কেন টেস্ট?

অনেকের ধারণা, বাংলাদেশকে তুলনামূলক ছোট দল হিসেবে দেখেই অস্ট্রেলিয়া এমন অপ্রচলিত ভেন্যু বেছে নিয়েছে। তবে বাস্তব কারণটি একেবারেই ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ার শীতকাল, স্থানীয় ক্রীড়া সূচি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত ক্যালেন্ডার মিলিয়েই উত্তরাঞ্চলের ডারউইন ও ম্যাকেতে এই সিরিজ আয়োজন করা হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের স্টেডিয়ামগুলো বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল বা এএফএল-এর জন্য ব্যস্ত। ফলে বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম টেস্ট ডারউইনের মারারা ওভালে আয়োজন করা হয়েছে। এই মাঠে ২০০৪ সালের পর প্রথমবারের মতো টেস্ট ক্রিকেট ফিরেছে। এরপর ২২ আগস্ট ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় হবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। ম্যাকের এই মাঠটি অস্ট্রেলিয়ার ১২তম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক করতে যাচ্ছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সিরিজ অস্ট্রেলিয়ার দুই দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম ঘরের মাঠের শীতকালীন টেস্ট সিরিজ। সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক টেস্ট মৌসুম গ্রীষ্মকালে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশ সিরিজটি ব্যতিক্রম। দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় দেশের উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়া এই সময়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল হওয়ায় ডারউইন ও ম্যাকেকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু আবহাওয়াই নয়, সূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ সিরিজটি মূলত ২০২৭ সালের মার্চে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ১৫০তম বার্ষিকী টেস্ট আয়োজনের জন্য সিরিজটি এগিয়ে আনা হয়। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচির মধ্যে এই অস্বাভাবিক সময়ে টেস্ট আয়োজনের প্রয়োজন তৈরি হয়।

ডারউইনের মারারা ওভালে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় প্রায় ১০ হাজার দর্শক বসতে পারেন। উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সাদা বলের ম্যাচে ম্যাকেতে ভালো দর্শক উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। মাঠের অবকাঠামো উন্নয়নে কুইন্সল্যান্ড সরকার ২ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি অর্থ দিয়েছে।

এই সিরিজকে বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণশক্তির দল। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন — অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ‘ফ্যাব ফোর’ দীর্ঘ সময় পর একসঙ্গে পুরোপুরি ফিট অবস্থায় দলে রয়েছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষেও রয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

তবে অদ্ভুত ভেন্যু মানেই বাংলাদেশের প্রতি অবহেলা, এমন ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বরং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট প্রধান জেমস অলসপ বলেছেন, দেশের সব প্রান্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পৌঁছে দেওয়া খেলাটির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাঞ্চলে ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ বাড়ানোই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার এটি মাত্র চতুর্থ টেস্ট সিরিজ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া ১-১ ব্যবধানে সিরিজ ড্র করেছিল। মিরপুরে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ২০ রানের জয় এখন পর্যন্ত দুই দলের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের একমাত্র জয়।

অস্ট্রেলিয়ায় শীতকালীন টেস্ট নিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্য কম। কিন্তু এবারের বাংলাদেশ সিরিজ দেখিয়ে দিয়েছে, দেশটির বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে মৌসুমের বাইরেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করা সম্ভব।

অর্থাৎ, ডারউইনে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট আয়োজনের পেছনে বাংলাদেশের দলীয় অবস্থান নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার শীতকাল, দক্ষিণের স্টেডিয়ামগুলোতে এএফএল-এর ব্যস্ততা, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক সূচি এবং উত্তরাঞ্চলে ক্রিকেট সম্প্রসারণের পরিকল্পনাই মূল কারণ।

Scroll to Top