সাপ মারতে জাপানে নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশি বেজি, শেষ পর্যন্ত ঘটেছিল উল্টোটা

১৯৭৯ সালে জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৩০টি বেজি। উদ্দেশ্য ছিল বিষধর হাবু সাপের উপদ্রব কমানো। কিন্তু বেজিগুলো সাপ শিকার করার বদলে শিকার করতে শুরু করল দ্বীপের বিরল সব প্রাণীকে। একসময় সেই ৩০টি বেজির সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১০ হাজারে। এরপর তাদের নির্মূল করতেই জাপানের লেগে গেল কয়েক দশক। খরচ হলো কোটি কোটি টাকা। গল্পটির শুরু অবশ্য আরও আগে। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নামও।

prothomalo bangla 2026 08 12 bkfoloc2 amamibeach
প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটারের আমামি ওশিমা দ্বীপটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ

ঘটনাটি জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের। প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপ পরে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়। দ্বীপটির বনভূমিতে এমন অনেক প্রাণীর বাস, যেসব পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এর মধ্যে অন্যতম আমামি খরগোশ—একটি বিরল ও বিপন্ন প্রাণী।

কিন্তু ১৯৭৯ সালে দ্বীপটির লোকজন এসব প্রাণীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিল না। তখন তাদের বড় ‘মাথাব্যথা’ ছিল হাবু—বিষধর একধরনের পিট ভাইপার সাপ।

হাবুর কামড় আমামি দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের জন্য বড় সমস্যা ছিল। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমামি দ্বীপপুঞ্জের আমামি ওশিমা, টোকুনোশিমা ও আশপাশের দ্বীপগুলোতে হাবুর কামড়ের ২ হাজার ৬৭৩টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল। তাই সাপ কমানোর একটি মোক্ষম উপায় খুঁজছিল কর্তৃপক্ষ।

prothomalo bangla 2026 08 12 zz6kf37m kinsakubaruwildwood
১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমামি দ্বীপপুঞ্জের আমামি ওশিমা, টোকুনোশিমা ও আশপাশের দ্বীপগুলোতে হাবুর কামড়ের ২ হাজার ৬৭৩টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল

বেজি যে সাপের শত্রু—এ তো জানা কথা। ‘চরম শত্রুতা’র বাগ্‌ধারাই হয়ে গেছে ‘অহিনকুল সম্পর্ক’। ফলে আমামি ওশিমার কর্তৃপক্ষও বেজিকেই মনে করেছিল সম্ভাব্য সমাধান।

জাপানে এর আগেও বেজি নেওয়ার ইতিহাস ছিল। ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে স্মল ইন্ডিয়ান মঙ্গুজ (Herpestes auropunctatus, বর্তমানে Urva auropunctata নামে পরিচিত) ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ওকিনাওয়া থেকেই প্রায় ৩০টি বেজি ১৯৭৯ সালে আমামি ওশিমায় আনা হয়। গবেষণায় এই বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া, আবার ওকিনাওয়া থেকে আমামি যাত্রাপথের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

ভাবনাটা ছিল সহজ—বেজি থাকবে, সাপ কমবে, মানুষ স্বস্তি পাবে। কিন্তু প্রকৃতি এত সহজ হিসাব মেনে চলল না।

prothomalo bangla 2026 08 12 yu8cle78 smallindianmongooseoʻahuhawaiʻi
১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে স্মল ইন্ডিয়ান মঙ্গুজ ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল

সমস্যার প্রথম কারণ ছিল বেজি আর হাবুর জীবনযাপনের পার্থক্য। হাবু মূলত নিশাচর। আর বেজি সক্রিয় থাকে দিনের বেলায়। অর্থাৎ যে শিকারিকে সাপ মারার জন্য আনা হয়েছিল, তার সঙ্গে শিকার হিসেবে নির্ধারিত সাপের দেখা হওয়ারই খুব বেশি সুযোগ ছিল না।

জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বেজিগুলো হাবু সাপের বদলে আমামি খরগোশসহ বহু স্থানীয় প্রাণীর ওপর শিকারি হিসেবে প্রভাব ফেলেছিল।

দিনের বেলায় যখন বেজি খাবার খুঁজছিল, তখন বনের আরও অনেক প্রাণী তার সামনে সহজ শিকার হয়ে উঠছিল। আর আমামি ওশিমার পরিবেশ বেজির বংশবিস্তারের জন্য ছিল যথেষ্ট অনুকূল। খাবারের অভাব ছিল না, বড় কোনো প্রাকৃতিক শিকারিও ছিল না। ফলে ৩০টি থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল বড় এক বেজিগোষ্ঠী। ২০০০ সালের দিকে আমামি ওশিমায় বেজির সংখ্যা পৌঁছে যায় আনুমানিক ১০ হাজারে

prothomalo bangla 2026 08 12 29zs6osr pentalagusfurnessi387708672
আমামি খরগোশ এতটাই বিরল যে জাপানে একে বলা হয় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’

এদিকে ওদের শিকারের তালিকায় চলে এসেছে আমামি খরগোশ, বিরল ব্যাঙ, স্থানীয় ইঁদুরসহ নানা প্রজাতি। এমন অনেক প্রাণীও ছিল, যাদের বিবর্তনের ইতিহাসে এ ধরনের শিকারি প্রাণীর সঙ্গে তেমন পরিচয়ই ছিল না।

অর্থাৎ যে প্রাণীকে একটি সমস্যা সমাধানের জন্য দ্বীপে আনা হয়েছিল, সেটিই হয়ে উঠল নতুন এবং আরও বড় পরিবেশগত সমস্যা। এক কথায়—‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ কিংবা ‘খাল কেটে কুমির আনা’!

এবার বেজি ধরাই হলো নতুন চ্যালেঞ্জ

১৯৯০-এর দশকে বেজি ধরার উদ্যোগ নিল স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তত দিনে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। শুরুতে ৩০টি প্রাণীকে ধরে ফেলা যতটা সহজ হতো, এখন কাজটি তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন। বেজিগুলো তত দিনে দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

২০০০ সালে শুরু হলো বড় আকারের নির্মূল অভিযান। ফাঁদ পাতা হলো, টোপ ব্যবহার করা হলো, ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি শুরু হলো। পরে বেজির গন্ধ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুরও কাজে নামানো হয়। ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় ‘আমামি মঙ্গুজ বাস্টার্স’ নামে বিশেষজ্ঞদের একটি দল।

কাজটি যত এগোতে লাগল, ততই কঠিন হতে থাকল। কারণ, শুরুতে যেসব বেজি সহজে ফাঁদে ধরা পড়ত, সেসব একে একে কমে গেল। বেঁচে থাকা বেজিগুলো ছিল আরও সতর্ক এবং ছড়িয়ে পড়েছিল দুর্গম এলাকায়।

জাপানকে একসময় দ্বীপজুড়ে ৩০ হাজারের বেশি ফাঁদ এবং ৩০০টির বেশি ক্যামেরা ব্যবহার করে নজরদারি করতে হয়েছে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল, ৯৯ শতাংশ বেজি ধরে ফেললেও কাজ শেষ নয়। কোথাও কয়েকটি বেজি, বিশেষ করে প্রজননক্ষম একটি স্ত্রী বেজি বেঁচে থাকলেও আবার বংশবিস্তার শুরু হতে পারে। তাই নির্মূল অভিযানে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শেষ কয়েকটিকে খুঁজে বের করা।

prothomalo bangla 2026 08 12 s9ddq9oz astonished
বেজি সক্রিয় থাকে দিনের বেলায়

শেষ বেজিটি ধরা পড়েছিল ২০১৮ সালে

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে একটি বেজি ফাঁদে ধরা পড়ে। এরপর আর কোনো বেজির সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু জাপান তখনই ঘোষণা করেনি যে দ্বীপটি বেজিমুক্ত। কারণ, কোনো প্রাণীকে একটি বিশাল এলাকায় পুরোপুরি নির্মূল করা হয়েছে—এ কথা বলা যতটা সহজ, প্রমাণ করা ততটাই কঠিন।

তাই ফাঁদ বসানো চলল। ক্যামেরা চলল। প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে অনুসন্ধান চলল। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর খুঁজতে থাকলেন, কোথাও কোনো বেজি লুকিয়ে আছে কি না।

অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করল, হ্যাঁ, আমামি ওশিমা থেকে বেজি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, নির্মূলের সম্ভাবনা ছিল ৯৮.৯ থেকে ৯৯.৭ শতাংশ।

১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া সমস্যাটির চূড়ান্ত সমাধান করতে তাই লেগে গেল প্রায় ৪৫ বছর!

খরচ হলো কত

prothomalo bangla 2026 08 12 xkn6py65 mangroveinamami
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমামি ওশিমা থেকে সব বেজি নির্মূল হয়

এই ভুলের মাশুল শুধু সময় দিয়ে নয়, দিতে হয়েছে বিপুল অর্থ দিয়েও। ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বেজি নির্মূল কর্মসূচিতে জাপানের খরচ হয়েছে প্রায় ৩.৫৭ বিলিয়ন ইয়েন, যা প্রায় ২৩.৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে, বর্তমানের কাছাকাছি বিনিময় হার ধরে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৯০ কোটি টাকা।

তবে গল্পের শেষটা শুধু ক্ষতির নয়। একটি গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে, আমামি ওশিমার জীববৈচিত্র্য বেজিমুক্ত রাখার এই প্রকল্পটি জাপানের মানুষের কাছে কতটা মূল্যবান। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একজন মানুষ গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫৩৯ ইয়েন এই প্রকল্পের জন্য দিতে রাজি ছিলেন।

পুরো জাপানের সম্ভাব্য উপকারভোগীদের হিসাবে সেই সামাজিক মূল্য দাঁড়ায় ২৫৩.৯ বিলিয়ন ইয়েনের বেশি, প্রায় ১.৬৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রকল্পে যে ২৩.৮২ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, তার তুলনায় এর সামাজিক মূল্য প্রায় ৭১ গুণ বেশি।

ভুলটা ছিল মানুষের

এখানে আদতে বেজিদের দোষ ছিল না। বেজিগুলো নিজেরা হেঁটে হেঁটে জাপানে যায়নি। ওরা জানতও না যে ওদের একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য সেখানে নেওয়া হয়েছে—সাপ মারতে হবে, অন্য প্রাণীকে নয়। ওরা শুধু বেঁচে থাকার জন্য যা করার, সেটিই করেছে। ভুলটা ছিল মানুষের সিদ্ধান্তে।

prothomalo bangla 2026 08 12 dsfz28j7 amamioshimaiss019
পাখির চোখে আমামি ওশিমার

মানুষ একটি সমস্যার দ্রুত সমাধান খুঁজতে গিয়ে ভেবেছিল, প্রকৃতির একটি প্রাণীকে নতুন পরিবেশে ছেড়ে দিলেই সে মানুষের ইচ্ছামতো একটি নির্দিষ্ট কাজ করবে। কিন্তু একটি প্রাণীকে একটি বাস্তুতন্ত্র থেকে সরিয়ে অন্য বাস্তুতন্ত্রে নিয়ে গেলে তার আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও বংশবিস্তারের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

আমামি ওশিমার বেজির গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই—প্রকৃতিতে কোনো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নতুন একটি প্রাণীকে সেখানে ছেড়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভুল শুধরাতে কখনো কখনো ৪৫ বছরও লেগে যেতে পারে।

সূত্র: জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস/ওরিক্স, এএফপি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ, ম্যামাল রিসার্চ

Scroll to Top