মান্নার ‘রংবাজ বাদশাহ’ সিনেমাটি কেন নায়ক জসিমকে উৎসর্গ করা হয়েছিল, ২৫ বছর পরে জানা গেল

prothomalo bangla2026 07 25j649v

২৫ বছর আগে মুক্তি পায় মান্না অভিনীত সিনেমা ‘রংবাজ বাদশা’। সিনেমাটি সেই বছর ব্যবসায়িক সফলতায় আলোচনায় ছিল। আলোচিত সেই সিনেমাটির শুরুতেই ভেসে আসে আরেক নায়ক জসিমের নাম। সিনেমাটি সে বছর নায়ক জসিমকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। কেন জসিমকে উৎসর্গ করা হয়; সিনেমাটির ২৫ বছর পূর্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেই কারণ জানালেন পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর।

নব্বই দশকের শুরুর দিকে। তখন ঢালিউডে তুমুল আলোচিত নাম জসিম। সেই সময় তরুণ নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর। তাঁর নির্মিত অ্যাকশন সিনেমাগুলো ভালো ব্যবসা করছিল। কিছু সিনেমা বেশ আলোচিত হচ্ছে। একসময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় আকবর-মান্না জুটির সিনেমা মানেই হিট তকমা লেগে থাকত। অন্যদিকে জসিম ১৯৯৮ সালে মারা যান। তাঁর ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ও মান্নার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সিনেমাগুলো অ্যাকশনের কারণে আলোচনায় ছিল। দুজনকে তুলনা করতেন অনেকে। সেই সময়েই মান্না হয়ে উঠছিলেন আলোচিত নাম।

মনতাজুর রহমান জানালেন, জসিম ও মান্না কখনোই কেউ কাউকে প্রতিযোগী মনে করেননি। কারণ, মান্না সবে দু–চারটি সিনেমা দিয়ে জায়গা করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে জসিম তখনো সুপারস্টার। একের পর এক হিট সিনেমা দিয়ে যাচ্ছিলেন। মনতাজুর রহমান জানান, তাঁর কাজ দেখে সাগরেদদের মাধ্যমে তাঁকে চিনেছিলেন জসিম। তিনি বলেন, ‘জসিম ভাই তখন আলোচিত নাম। তিনি ছিলেন আমাদের অনেক সিনিয়র। আমাকে “তুমি” বলে সম্বোধন করতেন। মূলত আমার সিনেমা দেখেই প্রথম পরিচয়।’

মনতাজুর রহমান আরও জানালেন, এফডিসিতে দেখা হলেই স্নেহের সুরে আকবরকে ডেকে পাশে বসাতেন। কথা হতো সিনেমা নিয়ে, ‘জসিম ভাই তো শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি তখন নতুন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো অতটা সাহস হতো না। হঠাৎ একদিন শুটিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এমন সময় জসিম ভাই ডেকে পাশে বসালেন। হেসে বললেন, “তুমি তো মান্নাকে নিয়ে আমার প্যাটানের ছবি বানাচ্ছ। আমাকে নিয়ে ট্রাই করো। আমাকে নিয়ে অ্যাকশন সিনেমা বানাও।” মজা করে কথাগুলো বলছিলেন। তখন জসিম ভাইয়ের শিডিউল পাওয়া অনেক বড় বিষয় ছিল। আমি তো সারপ্রাইজড হলাম।’

prothomalo bangla2026 07 256kza0

কেন অভিভূত হলেন? কারণ, উল্লেখ করে মনতাজুর রহমান আকবর বললেন, ‘জসিম ভাই অনেক গুণী, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও তিনি জুনিয়রদের সম্মান দিতেন। অনেক উৎসাহ দিতেন। এটাও কিন্তু আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি অনুপ্রেরণা ছিল। পরবর্তীতে আমাদের নির্মাতারা এই সহযোগিতা পায় নাই।’

মনতাজুর রহমান তখন নিয়মিত সিনেমা বানালেও জসিমের সঙ্গে সিনেমায় কাজ করা হয়ে উঠছিল না। এটাও একসময় ঢালিউডে আলোচনা বিষয় হয়। কারণ, এত দিন জসিমকে দর্শক অ্যাকশন সিনেমায় বেশি দেখেছেন। আকবরের সেই অ্যাকশন সিনেমায় জসিম নাই। ‘একদিন আড্ডায় জসিম ভাই ঢালিউড সিনেমার অনেক কিছু নিয়ে কথা বলছিলেন। এমন সময় ভাই (জসিম) বললেন, ‘আমার গল্পগুলো তুমি বলছ। কিন্তু আমি কাজ করতে পারছি না। আমার অনেক আফসোস হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও কেন যেন হয়ে উঠছে না।”’

prothomalo bangla2026 07 253y73z

এরপরে একসঙ্গে পরিকল্পনা করেন সিনেমা করার। জানা যায়, সেই সিনেমার নাম ‘বশিরা’। সিনেমার গল্প শুনে অনেক খুশি জসিম। গল্প শুনে সেদিন জসিম বলে দিলেন, ‘এটা আমার গল্প। আমার জন্য লেখা, এই গল্প আমি করতে চাই।’ কিন্তু অনেক কিছু চূড়ান্ত হয়েও শেষ মুহূর্তে সিনেমাটিতে কাস্টিং করা হয় মান্নাকে। এতে কারোরই কোনো মান–অভিমান ছিল না।

মনতাজুর রহমান আকবরের আলোচিত সিনেমা ‘শান্ত কেন মাস্তান’। মান্না অভিনীত সেই সিনেমা দেখতে দর্শক ভিড় করে হলে। ব্যবসায়িক ভাবে সিনেমাটি আলোচিত হয়। সেই সময় এফডিসির ৪ নম্বরে ফ্লোরে শুটিং করছিলেন জসিম। ‘দূর থেকে আমাকে দেখেই জসিম ভাই ডাক দেয়। জসিম ভাই বললেন, “তুমি তো হিট। ঢালিউডের হিট ডিরেক্টর। তোমার “শান্ত কেন মাস্তান” সিনেমাটি রিলিজের দিনই গুলিস্তানে দেখেছি। “শান্ত কেন মাস্তানের অ্যাকশন দেখে মনে হচ্ছিল, আমি জসিম নিজেই অভিনয় করছি।” তখন আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালো। পরিকল্পনায় ছিল জসিম ভাইকে নিয়ে বড় বাজেটে ভালো কাজ করব। ভাইয়ের কাছে দোয়া চাইলাম। দুর্ভাগ্য, সে বছরই তিনি মারা গেলেন,’ বলেন মনতাজুর রহমান।

এই পরিচালক জানালেন, ইচ্ছা-পরিকল্পনা থাকার পরও জসিমের সঙ্গে কোনো কাজ না হওয়ার আফসোস ছিল। ‘এই ঘটনাটি আমাকে বেশ কষ্ট দিত। পরবর্তীতে আমি ও প্রযোজক (মীর এনামুল করিম) আমান একসঙ্গে মান্নাকে নিয়ে “রংবাজ বাদশা” সিনেমাটি শুরু করি। সিনেমাটির পরিকল্পনা থেকে শুটিং পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় জসিম ভাই ছায়ার মতো ছিলেন। আমান ভাইয়ে বন্ধু ছিলেন জসিম ভাই। তিনিও প্রিয় মানুষকে হারিয়ে অসহায় বোধ করেছিলেন।’

দুজনই চেয়েছিলেন জসিমকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। সেই সুযোগ হিসেবে বেছে নেন ‘রংবাজ বাদশা’ সিনেমাটি। মনতাজুর রহমান বলেন, ‘জসিম ভাইয়ের প্রতি আমার ও আমান ভাইয়ে শ্রদ্ধা থেকে সিনেমাটি তাঁকে উৎসর্গ করি। জসিম ভাইয়ের প্রতি এমন ভালোবাসা জানিয়ে আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম। সেই সময় তাঁর চলে যাওয়াটা সিনেমার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল।’

২০০১ সালে  দেশের প্রেক্ষাগৃহে ‘রংবাজ বাদশা’ মুক্তি পায়। সিনেমাটি দর্শকদের মধ্যে আলোচিত হয়। সাধারণ এক প্রতিবাদী বাদশার একসময় রংবাজ হয়ে ওঠার গল্প। ২৫ বছর আগের স্মৃতি স্মরণ করে পরিচালক বলেন, ‘সেই সময় সিনেমার শুরুতে জসিমের প্রতি উৎসর্গ করায় ভক্তরা প্রশংসা করেছিলেন। জসিমকে উৎসর্গ করায় মান্নাও বেশ খুশি হয়েছিল।’

Scroll to Top