ফেলনা জিনিসের খেলনা বানিয়ে রপ্তানি করেন মাগুরার সাউয়াদা

prothomalo bangla 2026 08 15 5kww8hah magura
পোষা প্রাণীর জন্য তৈরি বিভিন্ন পণ্য দেখাচ্ছেন উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম। সম্প্রতি মাগুরার জাগলা এলাকায়

বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা সাধারণ উপাদান দিয়ে বিশ্ববাজারের উপযোগী পণ্য তৈরির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মাগুরার জাগলা এলাকার আঙ্গারদাহ গ্রামের উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম। তিনি পেঁপের নল, শজনের ডাল-পাতা, নারকেলের ছোবড়া, আম ও নিমগাছের চিকন ডাল কিংবা পাকচং ঘাসের মতো স্থানীয় উপকরণ দিয়ে পোষা প্রাণীর খাবার, পোশাক ও খেলনা মিলিয়ে ৪০০ ধরনের পণ্য তৈরি করেন। আর সেগুলো রপ্তানি হয় জাপান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি উন্নত দেশে।

ষাট ছুঁই ছুঁই সাউয়াদা ইসলাম গ্রামীণ অর্থনীতিতে খুলে দিয়েছেন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নারীর ক্ষমতায়নে। যেমন মাগুরার জাগলা এলাকার আঙ্গারদাহ গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০০ স্থানীয় নারীর।

জানা গেছে, দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে সাউয়াদা ইসলাম দেশে ফিরে শতভাগ দেশি কাঁচামালনির্ভর এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে উৎপাদিত হয় প্রচুর রপ্তানিমুখী পণ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড মোট ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশি মুদ্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার মতো (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা ধরে)। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে জাপানে। এরপর দ্বিতীয় বড় ক্রেতা দেশ কানাডা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায়ও রপ্তানি হচ্ছে তাঁর পণ্য।

গ্রামে সুশৃঙ্খল কর্মক্ষেত্র

সম্প্রতি মাগুরা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে আঙ্গারদাহ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রায় ২৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় শত শত নারী শ্রমিক বেশ সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছেন। কেউ ব্যস্ত কাপড় ও চামড়া দিয়ে কুকুরের জন্য আকর্ষণীয় বেল্ট তৈরিতে। কেউবা নিপুণ হাতে ঘাস বুনে তৈরি করছেন পাখির শৈল্পিক বাসা। আবার দলবেঁধে নারীরা ঘাস, শজনের ডাল, ডাঁটা ও পাতা শুকাচ্ছেন।

কর্মকর্তারা জানান, কারখানাটিতে চারটি অংশ রয়েছে। একটিতে পোষা প্রাণীর পোশাক ও একটিতে কুকুর-বিড়ালের খেলনা তৈরি হয়। তৃতীয় অংশে তৈরি হয় পোষা প্রাণীর খাবার ও স্ন্যাকস। অন্য অংশটিতে করা হয়েছে ঘাসের কারখানা, যেখানে খরগোশ, গিনিপিগ ও ইঁদুরের খেলনা এবং খাবার তৈরি হয়। তাঁরা জানান, পেঁপের নল প্রক্রিয়াজাত করে খরগোশ, গিনিপিগ ও হ্যামস্টারের খাবার তৈরি করা হয়। পোষা কুকুরের দাঁত পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা হয় নিমের ডাল। কুকুর এই ডাল চিবিয়ে ফেলে দেয়। তাতে কুকুরের দাঁত পরিষ্কার হয়ে যায়। ঘাস দিয়ে তৈরি করা ইঁদুরের ঘর যাচ্ছে কানাডায়। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পোষা প্রাণীর প্রায় ৪০০ রকমের খাবার ও খেলনা তৈরি হচ্ছে।

পাঁচজন কর্মী নিয়ে শুরু

মাগুরা শহরের কেশব মোড় এলাকায় জন্ম নেওয়া সাউয়াদা ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন। পারিবারিক কারণে একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে জাপানে পাড়ি জমান। কিন্তু ‘আমেরিকান ড্রিম’ কিংবা জাপানের উন্নত জীবনযাপন ছেড়ে তিনি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসেন।

সাউয়াদা ইসলাম বলেন, ‘যে মাটিতে মানুষের জন্ম হয়, সেই মাটির প্রতি তাঁর এক বিশাল ঋণ তৈরি হয়। আর এই ঋণ শোধ করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সে কাজটাই এখন করছি।’

সাউয়াদা ইসলাম জানান, ‘কাউকে মাছ না দিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা শেখানোর’ দর্শন এবং বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার পাশে থাকার তাড়না থেকেই তিনি জন্মস্থান মাগুরায় ফিরে আসেন। এরপর পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁর মাথায় আসে এদের খাবার ও খেলনা তৈরির ব্যতিক্রম ভাবনা। সে অনুযায়ী, ২০১৮ সালে গড়ে তোলেন বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড। মাত্র চার-পাঁচজন কর্মী নিয়েই শুরু হয় তাঁর এই পথচলা।

মাত্র দুই ধরনের খেলনা তৈরির মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। ওই বছরেই প্রথম চালানে জাপানে তিন হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন কর্মীর প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের। কারখানাতেই তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এভাবে সাউয়াদা ইসলামকে সফল হতে দেখে পরবর্তী সময়ে জাপান ও সিঙ্গাপুরের দুটি প্রতিষ্ঠান বোল্ড পার্টনারস লিমিটেডে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি

সাউয়াদা ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, প্রায় ২৫ একর জমিতে চলছে তাঁর এই প্রকল্প। সেখানে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনার কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন গাছ ও ঘাস রোপণ করা হয়েছে। বিদেশ থেকে পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকায় বেশি পণ্য উৎপাদন করতে এখন অন্যদের কাছ থেকেও কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। পেঁপের নল, আম ও নিমের ডাল কিংবা ঘাস এসব জিনিস কারখানায় নিয়ে এলেই তা নগদ টাকায় কেনা হয়। এই অভিনব উদ্যোগের ফলে গ্রামের শতাধিক মানুষ এখন পেঁপের নল, আম ও নিমের ডাল কিংবা ঘাস ইত্যাদি কুড়িয়ে কারখানায় নিয়ে আসেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড শুরু থেকেই কাজ করছেন সুপ্রিয়া রানী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখানে কাজ করে জমি কিনেছি, বাড়ি করেছি, সংসারের অনেক চাহিদাই পূরণ হয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, বাড়িতে থেকেই চাকরি করতে পারছি।’

সুপ্রিয়া রানীর মতো প্রায় ২০০ নারী শ্রমিক এখানে সরাসরি চাকরি করেন। তাঁদের যাতায়াতের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা আছে। এর পাশাপাশি আরও ৩০০ নারী বাড়িতে বসেই বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম জানান, বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনা পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। বর্তমানে এই বাজারের বড় অংশ ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম দখলে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো প্রায় শূন্যের কোঠায় আছে।

সাউয়াদা ইসলাম চান, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এ ধরনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। কারণ, বিশ্ববাজারে যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তা পূরণে সারা দেশে এমন অসংখ্য উদ্যোক্তার প্রয়োজন।

Scroll to Top