ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা বেড়েছে, ঋণ নিয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরি পাচ্ছেন না স্নাতকেরা

prothomalo bangla2f2026 08 192fmqxa3iat2fj94rpt9neet ug 2026 reexam625x30021june26

ভারতে ‘নলেজ পার্ক’ বলতে এমন এক পরিকল্পিত অঞ্চলকে বোঝায়, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি এবং স্টার্ট-আপগুলো একত্রে গড়ে তোলা। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি নলেজ পার্ক গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চল মূলত অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত।

উত্তর ভারতের ‘নলেজ পার্ক থ্রি’ (গ্রেটার নয়ডা এলাকা) তেমনি একটি বড় শিক্ষা কেন্দ্রের অংশ। এটি গড়ে উঠেছিল এমন একটি প্রতিশ্রুতির ওপর—কলেজের ডিগ্রি তরুণ ভারতীয়দের মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছে দেবে। কিন্তু রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্র থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে গড়ে ওঠা বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এলাকায় পড়তে আসা প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীর অনেকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। ডিগ্রির বদলে তাঁদের অনেকের ভাগ্যে জুটছে ঋণ আর একরাশ হতাশা।

এ এলাকার পাঁচটি নলেজ পার্কে গত এক দশকে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়াতে পরিবারগুলো তাদের সঞ্চয় শেষ করছে। কিন্তু প্রতিবছর যত শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করছেন, সেই তুলনায় ভালো বেতনের চাকরি তৈরি হচ্ছে অনেক কম।

উত্তর ভারতের বারানসি শহরের ১৮ বছর বয়সী হর্ষিত রাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিংসহ চাকরি পেতে কাজে লাগতে পারে—এমন সব বিষয় পড়ছেন। নয়ডা ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে তাঁর ডিগ্রি শেষ করতে প্রায় ১৫ হাজার ডলার খরচ হবে। এর মধ্যে সাত হাজার ডলার ব্যাংকঋণ। তাঁর লক্ষ্য মাসে ৮০ হাজার রুপি বা বছরে প্রায় ১০ হাজার ডলার আয় করা। তবে এর অর্ধেক বেতনের চাকরি পেলেও তিনি রাজি হয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে শুধু পড়াশোনার খরচের সমান অর্থ আয় করতে তাঁর পাঁচ থেকে ছয় বছর চলে যাবে। স্নাতক হওয়ার এক বছর পর তাঁর ঋণের ওপর বছরে ১০ শতাংশ হারে সুদ যোগ হওয়া শুরু হবে। হর্ষিত বলেন, ‘কিছুটা চাপ অনুভব করি। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে?’

ভারতের তরুণদের মধ্যে এই উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত মাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের (ককরোচ জনতা পার্টি সিজেপির ডাকে) মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বিরলভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রকাশ্য বিক্ষোভ এখন কমে এসেছে, কিন্তু যে হতাশা থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা রয়ে গেছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় কারচুপির অভিযোগ ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা ভালো জীবনের পথে তরুণদের সামনে থাকা নানা বাধার বিরুদ্ধে ক্ষোভে পরিণত হয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ডাকে শুরু হয় বিক্ষোভ। ভারতের প্রধান বিচারপতি মে মাসে দেশটির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে একটি মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যের ইঙ্গিতেই দলের এই নাম রাখা হয়। তরুণদের অসন্তোষের একটি বড় কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও।

ভারতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। প্রতিবছর এই সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ করে বাড়ছে।

যেসব পরিবারের কিছু অর্থ আছে, তাদের কাছে শিক্ষা কম মজুরির কৃষিকাজ ও শ্রমের জীবন থেকে বেরিয়ে আসার কয়েকটি পথের একটি। সবচেয়ে ভালো সুযোগ হলো দেশের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো একটিতে ভর্তি হওয়া। যাঁরা সেখানে সুযোগ পান না, তাঁদের সামনে বিকল্প হিসেবে থাকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভারতে বেসরকারি শিক্ষার এই ব্যবসা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের এক দশকে বেসরকারি কলেজের সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে।

ভালো জীবনের আশায় পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে। কিন্তু ভালো বেতনের চাকরির অভাবে সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ। এক দশক আগের তুলনায় এটি ৪১ শতাংশ বেশি। উচ্চশিক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েন। উচ্চশিক্ষা যত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, সেই গতিতে ভালো চাকরি তৈরি হয়নি।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সী কলেজ স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার।

ভারতে মাসে ৫০০ ডলারের বেশি বেতনের নতুন চাকরি বছরে তৈরি হয় মাত্র প্রায় আড়াই লাখ। দেশটির বেশি আয় করা ব্যক্তিদের মধ্যে আরামদায়ক জীবনযাপনের একটি মানদণ্ড হিসেবে এই বেতনকে বিবেচনা করা হয়। এসব চাকরির প্রতিযোগিতায় নামী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা অনেক এগিয়ে থাকেন।

উদ্যোক্তা ও একটি শিক্ষা ফেলোশিপ কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় সাক্সেনা বলেন, ‘তরুণদের কাছে একটি মিথ্যা বিক্রি করা হয়েছে। সেটি হলো, ডিগ্রি পেলেই চাকরি পাওয়া যাবে।’

ভারতে প্রায় ৫৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এগুলোর মাত্র এক-দশমাংশকে অভিজাত বা সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবেদনকারীদের ৫ শতাংশেরও কম ভর্তির সুযোগ পান। সেখানে বছরে গড় টিউশন ফি ২৫০ ডলারের কম। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি ডিগ্রি একজন শিক্ষার্থীকে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাকরিগুলোর দিকে এগিয়ে দিতে পারে। বাকিদের সামনে থাকে অনেক বেশি ঝুঁকির হিসাব।

অক্ষয় সাক্সেনার হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে পড়ার জন্য ২০ হাজার ডলারের বেশি খরচ করেন। তাঁদের আশা, ডিগ্রি শেষ করে তাঁরা বড় অঙ্কের বেতন পাবেন। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতকদের বার্ষিক মধ্যম বেতন প্রায় তিন হাজার ডলার। তিনি বলেন, ‘গড়পড়তা একজন স্নাতকের চাকরি পাওয়ার উপযোগিতা মাত্র ২০ শতাংশের মতো।’

এই অসামঞ্জস্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাকে অক্ষয় সাক্সেনা বলেছেন ‘ভয়াবহ জাতীয় মানসিক সংকট’।

একসময় প্রকৌশল ডিগ্রিকে ভারতের প্রযুক্তি খাতে ঢোকার নির্ভরযোগ্য পথ মনে করা হতো। তাই এসব ডিগ্রি পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ইনফোসিস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের মতো কোম্পানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দিয়ে বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলেছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এখন এসব চাকরির ভবিষ্যৎও আগের চেয়ে অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।

ভারতের ক্লাউড সফটওয়্যার কোম্পানি জোহো সহপ্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভারতে ডিগ্রি নেওয়ার জন্য বড় অঙ্কের ঋণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার নামে তরুণদের ঋণের ফাঁদে ফেলা উচিত নয়।’

নয়াদিল্লির উপকণ্ঠ নয়ডায় অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কম খরচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেলে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয় বিকল্প হিসেবে আসে। অতুল আনন্দ নিজের রাজ্য বিহারের একটি শীর্ষ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর আগে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে তিনি সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। পরে ঋণ করে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ডিগ্রি ও জীবনযাত্রার খরচ মিলিয়ে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার ডলার (১ ডলার সমান ৯৫ দশমিক ৭০ ভারতীয় রুপি) লাগবে। রাজ্য সরকার এ খরচের জন্য তাঁকে চার হাজার ডলার ঋণ দিয়েছে। বাকি অর্থ জোগাতে তাঁর পরিবার সঞ্চয়ের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছে।

Scroll to Top