স্প্যানিশ ফুটবলের গোপন সোনার খনি আসলে যেখানে

prothomalo bangla 2026 07 26 dz653ho4 foi soc spo wcs spain v argentina final fifa world cup 2026 231349
১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন

ছোট্ট একটা মাঠ। ঘাসের বদলে কোথাও ধুলা, কোথাও কাদা। বলটা পায়ে পায়ে ঘোরে বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসা পর্যন্ত। কোচ চিৎকার করেন না, শুধু দেখেন। এমন হাজারো মাঠ ছড়িয়ে আছে স্পেনের আনাচকানাচে। যেখানে খেলে হাজারো ছেলে। স্পেন জানে, এমন হাজারটা ছেলের মধ্যে থেকেই একদিন গড়ে উঠবে একটা প্রজন্ম, যারা বিশ্ব শাসন করবে।

সেই বিশ্বাসের হিসাব এবার সংখ্যায় লিখে দিল লা লিগা নিজেই। গত এক দশকে স্প্যানিশ ফুটবলের সাফল্য আর তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলার বিনিয়োগ—এই দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে লা লিগা। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং গত ১০ বছরে পুরুষ, নারী ও যুব দলের মিলিত সাফল্যকে ভিত্তি করেই তৈরি এ গবেষণা। লা লিগার ফুটবল প্রজেক্টস বিভাগের তৈরি এই গবেষণা বলছে, গত ১০ বছরে ইউরোপের সবচেয়ে সফল জাতীয় দল স্পেন। দেশটির পুরুষ ও নারী দল মিলিয়ে সিনিয়র ও যুব পর্যায়ে জিতেছে মোট ২৩টি শিরোপা।

বাকিদের সঙ্গে ব্যবধানটাও চোখে পড়ার মতো। ৯টি শিরোপা নিয়ে এর পরের অবস্থানে জার্মানি, ইংল্যান্ড ৭টি, ফ্রান্স ও পর্তুগাল সমান ৬টি করে, নেদারল্যান্ডস ৫টি আর ইতালি ৪টি।

এ গবেষণায় দেখা হয়েছে জাতীয় দলের সাফল্য আর ক্লাবগুলোর কাজের সম্পর্ক। বিশেষ করে লা লিগা ও এর নিচের ধাপের ক্লাবগুলো কীভাবে নিজেদের একাডেমিতে বিনিয়োগ করেছে। ২০১৬ সালের পর থেকে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। ক্লাব, ফেডারেশন আর লিগ মিলে তৈরি করেছে একধরনের ‘সম্মিলিত পরিকল্পনা’। ২০২২ সালে চালু হয়েছে জাতীয় একাডেমি উন্নয়ন পরিকল্পনা।

prothomalo bangla 2026 05 02 zofq55la fbl esp liga realmadrid barcelona 174325
লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা

এ পরিকল্পনার পেছনে কাজ করা লা লিগার ফুটবল প্রজেক্টস বিভাগের প্রধান হুয়ান ফ্লোরিত বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তরুণদের গড়ে তোলা শুধু মাঠে নয়, অর্থনীতিতেও ফল দেয়। আমরা ক্লাবগুলোর সঙ্গে কাজ করি। জ্ঞান ভাগাভাগি করি। একাডেমির মান বাড়াই। কিন্তু প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব দর্শনও রক্ষা করি।’

২০২৬ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দল যেন সেই কঠিন কাজের ফল। বিশ্বকাপের জন্য স্পেনের ডাকা ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৫ জনই শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে একাডেমি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছেন। এই চ্যাম্পিয়নদের গড়ে তোলার পেছনে সরাসরি জড়িত ছিল লা লিগার ১১টি ক্লাব। এতে প্রমাণিত হয়, জাতীয় দলের এই সাফল্য কয়েকটা একাডেমির কীর্তি নয়; বরং একটা বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময় আর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত পুরো ব্যবস্থার ফসল।

আর এই খেলোয়াড়েরাই পরবর্তী সময়ে অন্য ক্লাবে পাড়ি জমিয়ে স্পেনকে এনে দিয়েছেন ৪৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরোরও বেশি। এ ছাড়া বিশ্বজয়ী দলের ৯ জন খেলোয়াড় এখনো নিজ ক্লাবেই রয়ে গেছেন, যাঁদের খেলোয়াড়ি বাজারমূল্য প্রায় ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো।

প্রতিবেদনে আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় একাডেমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের খেলিয়েছে লা লিগা। মোট খেলার সময়ের ২০.১ শতাংশ। ফ্রান্স ১৬.১, জার্মানি ১১.৯, ইংল্যান্ড ৮.৩, ইতালি ৭.৬।

যেসব ক্লাব একাডেমি স্নাতকদের সবচেয়ে বেশি সুযোগ দেয়, তাদের মধ্যে ২০২৫-২৬ মৌসুমের তালিকায় শীর্ষে অ্যাথলেতিক বিলবাও (৬৯.৫% মিনিট একাডেমি স্নাতকদের দখলে), এরপর রিয়াল সোসিয়েদাদ (৫৫.২%), বার্সেলোনা (৪৭.৫%), সেল্তা ভিগো (৪৩.১%), ওসাসুনা (২৬.১%) ও সেভিয়া (২৫.০%)। ভ্যালেন্সিয়া ২৩.৮% আর রিয়াল মাদ্রিদ ২৩.১% নিয়ে তাদের পরে।

prothomalo bangla 2026 07 14 u1iymx00 2026 07 14t202201z2121978896up1em7e1kkoufrtrmadp3soccer worldcup fra esp
ফ্রান্সের বিপক্ষে গোলের পর স্পেনের উদ্‌যাপন

দ্বিতীয় বিভাগেও একই ছবি। রেসিং ক্লাব, দেপোর্তিভো লা করুনিয়া আর মালাগা উঠে এসেছে প্রথম বিভাগে। তিন দলই নিজেদের একাডেমির খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করেছে। মালাগা ৫৭.৩ শতাংশ সময় দিয়েছে তাঁদের। রেসিং ২১.৪, দেপোর্তিভো ১৭.৭। তিন ক্লাবের দলেই ছিলেন সবচেয়ে বেশিসংখ্যক একাডেমি স্নাতক, মালাগায় ১১ জন, রেসিংয়ে ৯ জন আর দেপোর্তিভোয় ৬ জন। এতেই স্পষ্ট, সাফল্যের পথে প্রতিভা গড়ে তোলার বিনিয়োগ কতটা নির্ধারক হতে পারে।

এ গবেষণায় ধরা পড়েছে স্প্যানিশ একাডেমি–ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যও, তাঁদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ২০২৪ ইউরো জেতা দল আর ২০২৬ বিশ্বকাপ জেতা দলের তুলনা করলেই যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুটো শিরোপাই স্পেন জিতেছে একেবারে ভিন্ন ধরনের ফুটবল খেলে।

ইউরোতে স্প্যানিশদের খেলা ছিল দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক–নির্ভর। বিশ্বকাপজয়ী দল আবার নির্ভর করেছে আরও সমষ্টিগত বল দখলে রাখা ফুটবলের ওপর। কিন্তু খেলোয়াড়েরা একই। শুধু তাঁরা বদলে গেছেন, মানিয়ে নিয়েছেন। এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই বলা হচ্ছে, স্প্যানিশ একাডেমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি একজন ‘সম্পূর্ণ খেলোয়াড়’।

নিজের দেশের ফুটবলের ছবি বদলে দেওয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে এই মডেল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজও করে যাচ্ছে লা লিগা। ইরাক, চীন, ভিয়েতনাম ও পেরুর মতো দেশের ক্লাব, ফেডারেশন আর লিগের সঙ্গে কাজ করছে তারা। কোথাও নতুন একাডেমি তৈরি, কোথাও কোচদের প্রশিক্ষণ চলছে। সব মিলিয়ে, প্রতিভা লালনের এই স্প্যানিশ মডেল বিশ্ব ফুটবলেই যেন এখন অনুকরণীয় এক উদাহরণ।

Scroll to Top