হেডকে দুঃখের পঞ্চম স্তরে নামালেন হাসান মাহমুদ

prothomalo bangla 2026 08 15 akbuf1li whatsapp image 2026 08 15 at 11.00.32 am
আউট হওয়ার পর স্টাম্পের বেলস ঠিক করছেন ট্রাভিস হেড। পাশেই সতীর্থদের নিয়ে হাসান মাহমুদের উদ্‌যাপন

মানুষের মনের দুঃখের গভীরতা কেমন? কেউ জানে না। তবে ট্রাভিস হেডকে দেখে আন্দাজ করে নেওয়া যায়। বেচারা!

কখনো কখনো অতি দুঃখে মানুষ বিস্ময়কর সব কর্মকাণ্ড করে বসে। ক্রিকেটে ব্যাপারটার প্রকাশ অনেক রকম। কেউ কেউ আউট হয়ে মনের দুঃখে ড্রেসিংরুমে ব্যাট ছুড়ে মারেন। কারও আবার ওই পর্যন্ত যাওয়ার দরকার হয় না। দেখা যায়, বাউন্ডারি সীমানা পেরিয়ে ছুড়ে মারছেন! আবার ফিল্ডিংয়ে অবিশ্বাস্য ভুলের পর মাথার চুল ছেঁড়ার চেষ্টাও করতে দেখা যায় ক্রিকেটারদের। কিন্তু ট্রাভিস হেড যেটা করেছেন, সেটা সম্ভবত দুঃখের সর্বশেষ স্তর।

সুইস-আমেরিকান মনোবিদ এলিজাবেথ কুবলার-রস ১৯৬৯ সালে তাঁর ‘অন ডেথ অ্যান্ড ডাইং’ বইয়ে দুঃখের পাঁচটি স্তরের কথা বলেন। পরে সেটাকে আরেকটু ভেঙে সাতটি স্তর করা হলেও দুঃখের আসল ভিত এলিজাবেথের সেই পাঁচটিই—অস্বীকার, ক্ষোভ, দর কষা, বিষণ্নতা এবং মেনে নেওয়া।

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে তখন ১১তম ওভার। হাসান মাহমুদের অফ স্টাম্পের বাইরে করা দ্বিতীয় বলটি টেনে স্টাম্পে এনে বোল্ড হন হেড। এরপর তাঁর অদ্ভুত কাণ্ডটি নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে? স্টাম্পের দিকে ঘুরে নিচে পড়ে থাকা বেলসটি তুলে আবারও স্টাম্পের মাথার ওপর বসালেন। স্টাম্প ঠিক করে তারপর হাঁটা ধরলেন ড্রেসিংরুমের পথে। ক্রিকেট মাঠে এমন দৃশ্য হামেশাই দেখা যায় না।

prothomalo bangla 2026 08 15 2d5tzqzb whatsapp image 2026 08 15 at 11.00.09 am
বোল্ড হয়ে হতাশ হেড

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট তো তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারেই কখনো দেখেননি। ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যে কিংবদন্তি বলেই ফেলেন সে কথা, ‘অবিশ্বাস্য দৃশ্য! আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে কখনো এমন দেখিনি। একজন ব্যাটসম্যান এতটাই হতাশ যে সে নিজেই ভেঙে পড়া স্টাম্প আবার ঠিক করল!’ অস্ট্রেলিয়ারই আরেক সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহও তাঁর অভিজ্ঞতা নিংড়ে বললেন, ‘অধিকাংশ ব্যাটসম্যান আউট হয়ে ক্ষোভে স্টাম্প ভেঙে ফেলেন, কিন্তু সে উল্টো নিজের হাতে বেলস তুলে বসাল!’

কথায় আছে, কেউ কারও দুঃখ বোঝে না। গিলক্রিস্ট এবং ওয়াহও সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারের কষ্টের পরিধিটা ঠাহর করতে পারেননি। হেড যে তখন তাঁর দুঃখের পঞ্চম ও শেষ স্তরে—মেনে নেওয়া। আউটটি শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন বলেই তো বেলস তুলে স্টাম্প ঠিক করলেন!

তার আগে বেলস পড়ার শব্দ শুনে নিশ্চয়ই বিষণ্নতা দানা বেঁধেছিল? আর ৩৫ বলে তাঁর ১৭ রানের ইনিংসটি আসলে বোলারদের সঙ্গে দর-কষাকষি—যেখানে তিনটি ৪ মারলেও হেড কখনোই স্বস্তিতে ছিলেন না। বাকি রইল ক্ষোভ ও অস্বীকার। সেটাও স্পষ্ট হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসেই। এই হাসান মাহমুদের বলেই বল স্টাম্পে টেনে বোল্ড হয়ে হেডের হতাশাসূচক মাথা নাড়ানোয় নিজের ওপর ক্ষোভ এবং মনে মনে ক্রিজে ছাড়তে না চাওয়ার বেদম ইচ্ছাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আসলে অস্ট্রেলিয়ার দুই ইনিংস মিলিয়ে দুঃখের পাঁচটি স্তরই পাড়ি দিতে হলো হেডকে।

prothomalo bangla 2026 08 15 nf6n1n4e whatsapp image 2026 08 15 at 11.00.43 am
বোল্ড হওয়ার পর বেলস কুড়াচ্ছেন হেড

স্টিভেন স্মিথও কোনো একটা স্তরে ছিলেন। সেটা অবশ্য দুঃখের নয়, স্মার্টনেসে। ব্যাপারটাকে অতি স্মার্টনেসও বলতে পারেন। সেটা ১৪তম ওভারের ঘটনা। ইবাদতের প্রথম বলে লিটন দাসের ক্যাচের আবেদনে আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আঙুল তোলার আগেই স্মিথ রিভিউয়ের আবেদন করেন! ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার কেরি ও’কিফের ভাষায়, ‘টেস্ট ক্রিকেটে অভিনব মুহূর্ত, যেখানে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই ব্যাটার রিভিউ নিয়েছেন।’

বাংলাদেশের সমর্থকদের দৃষ্টিকোণ থেকে ওই মুহূর্তটির ব্যাখ্যা ভিন্নরকম হতে পারে। ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া তখন ২ উইকেটে ৪০। ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যানদের মাথায় সব রকম বিপর্যয় উঁকি দেওয়ার কথা। স্মিথ সম্ভবত সে জন্যই একটু মরিয়া ছিলেন। যেহেতু নিজে বুঝেছিলেন আউট হননি এবং সেটা নিশ্চিত করতে মাঠে অন্য কাউকে তাই হয়তো সুযোগ দেননি। তাতে একটি বাংলাদেশের সমর্থকদের বেশ শান্তি শান্তি লাগার কথা।

prothomalo bangla 2026 08 15 vq5pyxtk whatsapp image 2026 08 15 at 12.35.05 pm
মারারা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বাংলাদেশের সমর্থকদের উদ্‌যাপন

না, মানে এত দিন তো ঘটেছে উল্টো। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়া যে অবস্থানে, এত দিন বাংলাদেশকে তাদের বিপক্ষে দেখা গেছে সেই একই অবস্থানে। হুট করে পাশার দান পাল্টে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের ভোগান্তি কিংবা আউট না হতে মরিয়া মনোভাব দেখাটা বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য অবশ্যই ভীষণ প্রশান্তির। অস্ট্রেলিয়ার জন্য আবার ব্যাপারটি আঁতে ঘা লাগার মতো। স্মিথের ঘটনায় তাঁদের সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারের মন্তব্য শুনুন, ‘স্টিভি যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটা আমার ভালো লাগেনি। এটা সে করতে পারে না। আমার দেখা দ্রুততম রিভিউ এটাই।’

সত্যি বলতে ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলের কাছ থেকে এমন অদ্ভুত অনেক কিছুই দেখা যাচ্ছে, যেসব ভুল কিংবা অদ্ভুতুড়ে আচরণ সাধারণত তাদের বিপক্ষে শক্তিতে একটু ছোট দলগুলো চাপে পড়ে করে থাকে। যেমন ধরুন স্মিথ এবং হেড—দুজনই সহজ ক্যাচ ফেলেছেন বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে। এর মধ্যে আজ তাসকিনের যে ক্যাচ স্মিথ ফেলেছেন, সেটা এতই সহজ যে ক্যাচ নয়, ‘মোয়া’ বলা যায়।

prothomalo bangla 2026 08 15 831i47mw whatsapp image 2026 08 15 at 11.39.43 am
অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, মার্ক ওয়াহ ও অ্যালিসা হিলি—অস্ট্রেলিয়ান তিন ধারাভাষ্যকার বিরতির সময় মাঠে। উত্তরসূরীদের পারফরম্যান্স নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না তাদের

স্মিথ টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। তাতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র ভরসাও চলে গেছে—বাংলাদেশের সমর্থক হলে এই কথাটা পড়তেও তো বুকটা জুড়িয়ে আসার কথা। মনের আনন্দে কেউ কেউ বলে বসতে পারেন, এই টেস্ট যেন শেষ না হয়, যেভাবে চলছে ঠিক এভাবেই চলুক—টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দল এত দিন একটু কম শক্তির দলকে দুঃখের পাঁচ স্তর দেখিয়ে এসেছে, এবার না হয় তারাও দেখুক!

আচ্ছা বলুন তো, এই টেস্টে তৃতীয় দিনে শেষ সেশন পর্যন্ত খেলা দেখে কী মনে হচ্ছে? অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দল কে? থাক, মনের কথা মনেই রেখে সুখের কয়েক স্তর দেখার আশায় বসে থাকুন স্ক্রিনের সামনে। কে জানে, বিষম চাপে পড়া অস্ট্রেলিয়ানদের কাছ থেকে হয়তো আরও অদ্ভুত কিছু দেখা গেলেও যেতে পারে!

Scroll to Top