ঢাকার কাছেই ইতিহাস ও প্রকৃতি : ঘুরে আসুন ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল

ob 1784438686

সংগৃহীত ছবি

যান্ত্রিক শহরের কোলাহল আর ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে যেখানে এক টুকরো সবুজ বন, শতবর্ষী মসজিদ আর জমিদার বাড়ির রাজকীয় স্থাপত্যের দেখা মেলে—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এমন এক অপূর্ব মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে টাঙ্গাইল জেলা। সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ মাঠ, নদী আর বনাঞ্চল যেমন দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে, তেমনি এখানকার প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনগুলো জাগিয়ে তোলে অতীতের সোনালী স্মৃতি।

পরিবার নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটাতে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট কোনো অ্যাডভেঞ্চারের জন্য টাঙ্গাইল হতে পারে একটি আদর্শ গন্তব্য। ঢাকা থেকে দূরত্ব কম হওয়ায় খুব সহজেই কম খরচে ও স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে ডে-ট্যুর কিংবা এক রাতের ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজানো সম্ভব। আসন্ন ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে টাঙ্গাইলের এই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক জায়গাগুলো হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণ ঠিকানা।

ob 1784438331

মহেড়া জমিদার বাড়ি

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মহেড়া জমিদার বাড়ি। ১৮৯০ সালেরও আগে স্পেনের করডোভা নগরের স্থাপত্যশৈলীর আদলে ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই রাজকীয় বাড়িটি নির্মাণ করেন কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামে দুই ভাই। এর প্রবেশমুখেই রয়েছে টলমলে জলের ‘বিশাখা পুকুর’। ভেতরে রয়েছে রোমান স্থাপত্যের কলাম সমৃদ্ধ গোলাপী রঙের ‘চৌধুরী লজ’, নীল-সাদার মিশ্রণে নির্মিত তিন তলার ঝুলন্ত বারান্দা বিশিষ্ট রাজকীয় ‘আনন্দ লজ’, এবং ‘মহারাজা লজ’ ও ‘কালীচরণ লজ’। বর্তমানে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই দৃষ্টিনন্দন কমপ্লেক্সে আরও রয়েছে ছোট পার্ক, চিড়িয়াখানা, বোট রাইড ও পিকনিক স্পট। মাত্র ৮০ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে এই স্বপ্নপুরীতে প্রবেশ করা যায় এবং ভেতরের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সুযোগ রয়েছে ৩০০ টাকার বিনিময়ে।

যাতায়াত: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্বে মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া গ্রামে এর অবস্থান। ঢাকা থেকে বাসে নাটিয়াপাড়া নেমে সরাসরি অটোরিকশায় এখানে আসা যায়।

ob 1784438390

২০১ গম্বুজ মসজিদ

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গম্বুজ এবং দ্বিতীয় উচ্চতম মিনার বিশিষ্ট অনন্য এক মুসলিম স্থাপত্য হলো টাঙ্গাইলের ২০১ গম্বুজ মসজিদ। গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদ কমপ্লেক্সের ছাদে রয়েছে ৮১ ফুট উচ্চতার একটি মূল গম্বুজ, যাকে ঘিরে রয়েছে ১৭ ফুট উচ্চতার আরও ২০০টি ছোট গম্বুজ। মসজিদের চার কোনায় ১০১ ফুট উচ্চতার চারটি এবং পাশে ৮১ ফুট উচ্চতার আরও চারটি মিনার রয়েছে। এর মূল আকর্ষণ হলো মসজিদের পাশেই অবস্থিত ৪৫১ ফুট উচ্চতার দেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম মিনারটি। ১৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এই দ্বিতল মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

যাতায়াত: মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি গোপালপুর বা ঝাওয়াইলের বাসে যাওয়া যায়। অথবা টাঙ্গাইল সদর থেকে লোকাল বাস বা অটোরিকশায় গোপালপুর সদর হয়ে দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব।

ob 1784438522

মধুপুর জাতীয় উদ্যান

নিসর্গপ্রেমীদের জন্য টাঙ্গাইলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মধুপুর জাতীয় উদ্যান। ১৯৬২ সালে প্রায় ২০ হাজার একরেরও বেশি বনাঞ্চল নিয়ে এই উন্মুক্ত উদ্যানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এই সংরক্ষিত বনে রয়েছে একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, যেখানে বন্যপ্রাণীদের মুক্ত বিচরণের দৃশ্য পর্যটকদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে। এছাড়া মধুপুরে ঘুরতে গেলে দেশসেরা ও সুস্বাদু আনারসের স্বাদ নিতে ভুলবেন না দর্শনার্থীরা।

যাতায়াত: ঢাকা থেকে ১২৫ কিলোমিটার এবং টাঙ্গাইল শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উদ্যানে মধুপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস বা অটোরিকশাযোগে সহজে যাওয়া যায়।

ob 1784438567

৪১৬ বছরের প্রাচীন আতিয়া মসজিদ

মুঘল ও সুলতানি আমলের অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া মসজিদ। প্রায় ৪১৬ বছর আগে নির্মিত এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি এক সময় বাংলাদেশের প্রচলিত ১০ টাকার নোটে দেখা যেত। ছোট পরিসরে নির্মিত ভিন্নধর্মী কারুকাজের এই যুগসন্ধিলগ্নের নিদর্শনটি দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন।

যাতায়াত: টাঙ্গাইল শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে আতিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি যাওয়া যায়।

ob 1784438641

টাঙ্গাইল ডিসি লেক

শহরের ভেতরেই বিনোদনপ্রেমীদের প্রধান আড্ডাস্থল হলো দৃষ্টিনন্দন ‘ডিসি লেক’। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৫ একর আয়তনের এই মৃতপ্রায় লেকটিকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার পর এটি এখন হাজারো শিশু ও সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে।

যাতায়াত: টাঙ্গাইলের নতুন বা পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে নেমে সরাসরি রিকশা নিয়ে এই পার্কে যাওয়া যায়। এছাড়া ট্রেনযোগে টাঙ্গাইল স্টেশনে নেমে বাসস্ট্যান্ড হয়ে অটোরিকশাতেও পৌঁছানো সম্ভব।

Scroll to Top